''নিজেকে মেয়েমানুষ ভাবার আগে মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে''
News Date : 1/26/2019 12:00:00 AM   |  Publish : 11/29/2019 3:34:11 AM

"নিজেকে মেয়েমানুষ ভাবার আগে মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে"

''নিজেকে মেয়েমানুষ ভাবার আগে মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে''

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে আমাদের দেশের নারীরা। সাহস বা কর্মদক্ষতা কোন কিছুতেই পিছিয়ে নেই তারা। বাংলাদেশের মূলধারার অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন। আমাদের দেশের নারীদের অক্লান্ত ও অব্যাহত পরিশ্রমের ফলেই নানান সম্ভাবনার রঙে শোভিত হচ্ছে এবং আরো বেশি সমৃদ্ধশালী হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। বাংলাদেশে অন্ট্রপ্রিনিয়শীপ অনেক সম্ভাবনাময় একটা সেক্টর। এটা এমন একটা পেশা যেটা শুধু নিজেকেই স্বাবলম্বী করে তা নয়, বরং আরো অনেকের কর্মসংস্থান তৈরীতে সহায়তা করে।

আমি শারমিন আকতার সাজ, উইমেন অন্ট্রপ্রিনিয়রস অফ বাংলাদেশ (উইবিডি)-র চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।ছোটবেলা থেকেই আমার বাবা-মা আমাকে 'মেয়েমানুষ' ভাবার আগে নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শিখিয়েছিলেন। আমার স্বপ্ন দেখা, স্বপ্ন পূরণের জন্য যুদ্ধ করার শক্তিটা সেখান থেকেই পেয়েছি আমি। আমার বেড়ে ওঠা নওগাঁ জেলার প্রত্যন্ত একটা গ্রামে। পরবর্তীতে শিক্ষাজীবন কেটেছে রাজশাহী এবং ঢাকাতে। আমার বাবা ছিলেন কলেজের প্রফেসর এবং মা সরকারি চাকুরীজীবী । যে সময়টায় সবাই পুতুল খেলা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতো সেই সময়টায় আমি বাবার হাত ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি অথবা মায়ের অফিসে গিয়ে মায়ের কাজ করা দেখেছি। বুঝি বা না বুঝি হাতের কাছে বই, পত্রিকা, ম্যাগাজিন যা পেতাম তাই পড়ে ফেলতাম। কোন মেয়ে ভালো কিছু করেছে দেখলে খুব ভালো লাগতো, অনুপ্রেরণা পেতাম, সাহস পেতাম। ওই সময় থেকেই বুকের মাঝে স্বপ্ন পুষেছিলাম আমাকেও ভালো কিছু করতে হবে। সমবয়সী বন্ধু-বান্ধবীর চেয়ে আমার স্কুলের শিক্ষক, আব্বুর কলেজের শিক্ষক এবং আম্মুর কলিগদের সাথেই আমার সখ্যতা বেশি ছিলো। তাদের দেখে দেখে আমি ওই সময়তেই অনেক কিছু শিখেছি যা আমার পথ চলা সহজ করেছে।

আমি পড়াশোনা করেছি ইলেক্ট্রিক্যাল এ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। আমার কর্মজীবন শুরুটা হয়েছিলো শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। টেকনোলজি নিয়ে কাজ করছি ২০১৩ সাল থেকে। পরবর্তীতে এডমিনিস্ট্রেশনেও কাজ করেছি দুই বছরের মতো। কিন্তু মনের মতো করে হয়ে উঠছিলোনা কোনকিছু। তাই আমি সিদ্ধান্ত নেই ৯টা-৫টা চাকরি বাদ দিয়ে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে অন্য কিছু করার এবং ভালো কিছু করার। সেই ভাবনা থেকেই কাজ শুরু করি আমার কোম্পানি বিনফোসিস নিয়ে। বিনফোসিস মূলত বিজনেস ও ইনফরমেশন টেকনোলজি সার্ভিস সমূহের ওয়ান স্টপ সল্যুশন হিসেবে কাজ করছে যেখানে আমি ফাউন্ডার ও সিইও হিসেবে কর্মরত আছি। বিনফোসিস এর সার্ভিস সমূহের মাঝে রয়েছে বিজনেস কন্সাল্টেন্সি সার্ভিস, অন্ট্রাপ্রেনাশিপ ডেভেলপমেন্ট, লিগাল ডকুমেন্টস, ফেসবুক পেজ ও ওয়েবপেজ ম্যানেজ, ব্র‍্যান্ডিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ফটোগ্রাফি ও সিনেমাটোগ্রাফি, ডোমেইন-হোস্টিং, ই-কমার্স সাইট ও ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, লোগো ডিজাইন, গ্র‍্যাফিক্স ডিজাইন, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল এপ্স ডেভেলপমেন্ট, রোবটিক্স সহ আরো বিভিন্ন বিষয়, যেখানে আমাদের ১১ জনের একটি টিম কাজ করছে।

তবে আমি সবসময় এমন একটা কিছু করতে চেয়েছি যেটা আমার নিজেকে সহ অন্য আরেকজন মানুষকে তথাপি আমার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। আমাদের দেশের নারীদের সাথে নিয়ে এগিয়ে যাবার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছি নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে অরগানাইজেশান 'উইমেন অন্ট্রপ্রিনিয়রস অফ বাংলাদেশ (উইবিডি)। নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী উদ্যোক্তাদের প্রচার প্রসার ও স্বীকৃতি দিয়ে তাদের নিয়ে এগিয়ে উইমেন অন্ট্রপ্রিনিয়রস অফ বাংলাদেশ উইবিডির মূল লক্ষ্য। উদ্যোক্তা হবার পথে অনেক বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। আর নারীদের ক্ষেত্রে সেটা আরো অনেক বেশি। যেহেতু আমি নিজে একজন উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার মধ্য বিভিন্ন সময় পার করেছি তাই আমি সবসময়ই চেষ্টা করেছি অন্য উদ্যোক্তাদের সাথে থেকে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করার। কারণ আমি বিশ্বাস করি জ্ঞান বিতরন করলে জ্ঞান কমেনা, বরং বাড়ে। আমি সবার হাত ধরে সবাইকে সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই।

উইমেন অন্ট্রপ্রিনিয়রস অব বাংলাদেশ (উইবিডি) আনুষ্ঠানিক ভাবে কাজ শুরু করে ২০১৮ সালে। খুব অল্পসময়েই উইবিডি জায়গা করে নিয়েছে আমাদের দেশের নারী উদ্যোক্তাদের হৃদয়ে। উইবিডি তে উদ্যোক্তা হিসেবে সদস্য সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে ইতোমধ্যে। নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে উইবিডি। নারী উদ্যোক্তা দের নিয়ে আমরা বিনামূল্যে এবং স্বল্প খরচে বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্কশপ ও সেমিনার করে থাকি, যেখানে ভালোভাবে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য তাদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়ে থাকে। উদ্যোক্তা তৈরীর লক্ষ্যে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছে ২০০০ জনেরও বেশি নারীদের। বেশিরভাগ উদ্যোক্তাদের অনলাইন কার্যক্রম হবার জন্য অফলাইনে তাদের পণ্য প্রদর্শনীর জন্য তাদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত হয়েছে উইবিডি উদ্যোক্তা পণ্য মেলার। আমাদের দেশের উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি দেশের বাইরের উদ্যোক্তা গন ও অংশগ্রহণ করে থাকেন আমাদের এই মেলায়। এছাড়াও নারী উদ্যোক্তাদের সঠিক পথ প্রদর্শন এবং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের স্বল্প মেয়াদী প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে উইবিডি কোন রকম ফি ছাড়াই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এছাড়াও অনলাইন সেবার মাধ্যমে সবসময়ই কানেক্ট থাকার চেষ্টা করি আমরা।

প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শুধু চাকুরীর উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছেন এবং কর্মসংস্থান তৈরীতে গ্রুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছেন আমাদের দেশের নারীরা। আমরা এমন সব উদ্যোক্তাদের নিয়েই কাজ করছি যারা আসলেই কিছু করতে চান। আর আমি বিশ্বাস করি একজন নারী যদি আরেকজন নারীকে সাহায্য করে তবে সামনের পথ চলাটা অনেক সহজ হবে। আরেকটা বিষয় যেটা না বললেই নয়, বিয়ে হবার পর বা বাচ্চা হবার পর অনেকেই ব্যবসা বা চাকরি ছেড়ে দেন , পরবর্তীতে ক্যারিয়েরে গ্যাপ চলে আসে। পরে শুরু করতে চাইলেও শুরু করতে পারেন না। অথবা বুঝে উঠতে পারেন না যে কিভাবে শুরু করবেন। অনেকেই নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করেন যে কেন এমন হলো বা আমার সাথেই কেন এমন হয় অথবা আমাকে দিয়ে আর কিছু হবে না। যারা এমন ভাবেন তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হবে আপনি যে যায়গাটায় আছেন ঠিক সেখান থেকেই শুরু করুন। সংসার, বাচ্চা সামলিয়েও কিন্তু অনেক কিছুই করা যায়। শুরু করার জন্য খুব বেশি কিছু প্রয়োজন নেই, যেটা থাকতে হবে সেটা হচ্ছে আপনার ইচ্ছাশক্তি আর কাজে লেগে থাকার মানুষিকতা। আপনি শুরু করলেই যে সাথে সাথে সফলতা আসবে তাও কিন্তু নয়। বাধা আসবেই। আমি নিজেও একবারে সফল হইনি। বারবার পিছিয়ে পড়েছি। অনেক ক্ষতির সম্মূখীন হয়েছি, কিন্তু ভেঙে পড়ে সবকিছু বন্ধ করে দেইনি, বরং ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নবউদ্যোমে কাজ শুরু করি, আরো বেশি ভালোভাবে। দৈনিক ১৭-১৮ঘন্টাও কাজ করি মাঝে মাঝে।কখনো কখনো এমন হয় যে ৪৮ ঘন্টায় মাত্র ৩-৪ ঘন্টা ঘুমিয়েছি। সপ্ন পূরনের জন্য কাজ করতে ভালোবাসি। নিজের কাজকে ভালোবাসি। নিজেকে ভালোবাসি। নিজেকে ভালোবাসি বলেই অন্যকে ভালোবাসতে পারি, অন্যের জন্য কাজ করতে পারি।

আসলে কোন কাজ ঠিক ভাবে করতে না পারা মানে কিন্তু নিজে হেরে যাওয়া নয়। একবারে না হলে বারবার চেষ্টা করতে হবে কোন একটা কাজে সফলতা আসল না তার মানে এই নয় যে আপনার সবকিছু শেষ। আপনি আর কিছু করতে পারবেন না, আপনাকে দিয়ে কিছুই হবেনা বা পরবর্তীতে আপনি আর কখনো সফল হতে পারবেন না। যে কাজটিতে আপনি সফল হোন নি বা ঠিক ভাবে করতে পারেন নি সেখান থেকেও কিন্তু আপনি অনেক মূল্যবান কিছু শিখে থাকবেন, যেটা আপনার পরবর্তীতে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। যেখান থেকে আপনি কিছু পাচ্ছেন সেটাকে হেরে যাওয়া বলেনা। নিজের কাজকে ভালোবাসতে হবে, সর্বোপরি নিজেকে ভালোবাসতে হবে। বিশ্বাস রাখতে হবে। নিজের কাজে সৎ থাকতে হবে। যেকোনো কাজ যদি ডেডিকেটেড ভাবে করা যায় তবে সফলতা আসতে বাধ্য। হাল ছাড়া যাবেনা। লেগে থাকতে হবে, কষ্ট করতে হবে, ধৈর্য সহকারে নিজের লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য কাজ করে যেতে হবে। সফলতা আসবেই।

আর মেয়েদের বলবো, আপনি আগে একজন মানুষ। তারপর মেয়ে। তাই নিজেকে মেয়েমানুষ ভাবার আগে মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে। আসলে নারীদের বাদ দিয়ে কখনোই পরিবারের, সমাজের বা দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য নারী পুরুষ উভয়েরই সম্মলিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে। হিংসা ভুলে একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পীকার নারী, আরো বিভিন্ন বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত আছেন নারীরা। নারীর ক্ষমতায়ন যত বাড়বে, নারীরা যত এগিয়ে যাবে ততোই এগিয়ে যাবে আমাদের দেশ ।।